Header Ads Widget

Responsive Advertisement

বাংলাদেশের অর্থনীতি: এক কঠিন মোড়ের মুখে


 



বাংলাদেশের অর্থনীতি: এক কঠিন মোড়ের মুখে

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা অনুযায়ী, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরটি প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে ভিন্নতা

  • বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশের নিচে নামতে পারে।

  • আইএমএফ-এর পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৮ শতাংশ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক ৩.৯৭ শতাংশের হিসাব থেকেও কম।

  • আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তা ৫.৪ শতাংশে আটকে থাকবে, যা তাদের পূর্বের পূর্বাভাসের (৬.৫ শতাংশ) চেয়ে অনেক কম।


কাঠামোগত সংস্কারের গুরুত্ব ও আইএমএফের সতর্কবার্তা

ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় গত সোমবার (২৩ জুন) বাংলাদেশকে ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের কিস্তি ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত ৮০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে এই অর্থায়নের সঙ্গে কঠোর সতর্ক বার্তা জুড়ে দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফ উল্লেখ করেছে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, কঠোর মুদ্রানীতি এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা। আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক বলেছেন, "বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুস্তরীয় চাপে রয়েছে। কাঠামোগত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।"


রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৬ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। মে মাস পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮৩.১০ শতাংশ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জুন মাসেই যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা আদায় করতে হবে, তা 'প্রায় অসম্ভব'।

  • ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা প্রকট হয়েছে। বর্তমানে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৪.১৩ শতাংশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বছরের শেষ নাগাদ এটি ৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে, ফলে নতুন বিনিয়োগে ঋণ দেওয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

  • বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।


সরকারি ঋণ নির্ভরতা ও সুদের চাপে বেসরকারি খাত

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১.০৪ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়। এতে তারল্য সংকট আরও তীব্র হবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হবে। সুদের হারও বাড়বে, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।


মূল্যস্ফীতির চাপ ও বৈদেশিক সংকট

  • চলতি অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৯.৯ শতাংশ থাকবে, যা ভোক্তা পর্যায়ে চাপ অব্যাহত রাখবে। আগামী অর্থবছরে তা কমে ৬.২ শতাংশে নামার পূর্বাভাস থাকলেও, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

  • বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

  • অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স, আমদানি-রফতানি ও শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে জটিলতা তৈরি হলে অনেক প্রবাসী চাকরি হারাতে পারেন।

  • তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশের মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যদিও সরকারি লক্ষ্য সাড়ে ৬ শতাংশ।


বিনিয়োগ-রফতানিতে ভাটা, কর্মসংস্থানে প্রভাব

দেশে ও বিদেশে বিনিয়োগ প্রবাহ কমে গেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাময়িকভাবে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে, তবে এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, "রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ডলার সংকট শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। এতে ঋণখেলাপির আশঙ্কা বাড়ছে।"


Post a Comment

0 Comments